যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি চলছে। আগামী শুক্রবার এ চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে চুক্তির বিভিন্ন শর্ত নিয়ে ইরানের রক্ষণশীল ও কট্টরপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
সমালোচকদের অভিযোগ, প্রস্তাবিত সমঝোতায় আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা নেই। একই সঙ্গে ক্ষতিপূরণ আদায় বা হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের প্রভাব বজায় রাখার বিষয়েও কোনো দৃঢ় প্রতিশ্রুতি উল্লেখ করা হয়নি বলে তারা দাবি করছেন।
ইরানের পার্লামেন্ট সদস্য কামরান গাজানফারি সরকারের বিজয়ের দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র নতি স্বীকার করেছে—এমন বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কট্টরপন্থী শিবিরের আরেক প্রভাবশালী ব্যক্তি মেইসাম নিলি এই সমঝোতাকে ইরানের জন্য ক্ষতিকর বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, জনগণের উচিত এ বিষয়ে নীরব না থেকে মতামত প্রকাশ করা।
অন্যদিকে, চুক্তির পক্ষে অবস্থান নেওয়া সরকারি কর্মকর্তারা সমালোচনার জবাব দিয়েছেন। আলোচনাকারী দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা মেহদি মোহাম্মাদি এক অডিও বার্তায় দাবি করেন, এই সমঝোতা আঞ্চলিক উত্তেজনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রশমনে ভূমিকা রাখবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এতে লেবাননসহ অঞ্চলের কিছু সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি নিয়েও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
মোহাম্মাদি আরও বলেন, ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে নতুন কোনো কঠোর অঙ্গীকারে বাধ্য করা হয়নি। উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা পরবর্তী ধাপে হবে। আগামী ৬০ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে পৃথক আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
তাঁর দাবি, দীর্ঘ আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো কিছু প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে নীতিগত সম্মতি দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, চুক্তির সমালোচকেরা পুরোনো খসড়ার ওপর ভিত্তি করে মন্তব্য করায় বিভ্রান্তির সৃষ্টি হচ্ছে।
পারমাণবিক ইস্যুতে চুক্তির মূল অবস্থান হলো—ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং এ ধরনের অস্ত্র সংগ্রহও করবে না। মোহাম্মাদির ভাষায়, এটি ইরানের বহুদিনের ঘোষিত নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সরকারপন্থী মহলের দাবি, নতুন এই সমঝোতা ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির তুলনায় ইরানের জন্য বেশি সুবিধাজনক হতে পারে। তাদের মতে, বর্তমানে ইরান আঞ্চলিকভাবে আগের তুলনায় শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে তার প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে বিদেশে আটকে থাকা ইরানের অর্থের একটি অংশ মুক্ত করার বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। প্রায় ১,২০০ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ এই অর্থ নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
চুক্তির বিরোধিতাকারীদের বড় অংশটি পার্লামেন্টের কট্টরপন্থী গোষ্ঠী এবং পেদারি ফ্রন্টের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাদের মধ্যে জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির সদস্য মাহমুদ নাবাভিয়ান ও কায়হান পত্রিকার সম্পাদক হোসেন শরিয়তমাদারির মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা রয়েছেন।
তেহরানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমঝোতাবিরোধী প্রচারণাও শুরু হয়েছে। ‘আমরা মেনে নেব না’ স্লোগান ব্যবহার করে অনলাইনে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন বিরোধীরা।
হোসেন শরিয়তমাদারি প্রশ্ন তুলেছেন, হরমুজ প্রণালি ইরানের অন্যতম কৌশলগত শক্তি হওয়া সত্ত্বেও কেন এর ব্যবহার সীমিত করার মতো কোনো পদক্ষেপ বিবেচনা করা হচ্ছে। একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মাহমুদ নাবাভিয়ানও। তাঁর মতে, চুক্তির ফলে ভবিষ্যতে ইসরায়েলসহ বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচলে বাধা দেওয়ার সুযোগ কমে যেতে পারে।
অন্যদিকে, সরকারপন্থীরা বলছেন, কট্টরপন্থীরা সব ধরনের সমঝোতার বিরোধিতা করে থাকে এবং তারা ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না। তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের সমাপ্তি সাধারণত সমঝোতার মাধ্যমেই আসে, সম্পূর্ণ বিজয়ের মাধ্যমে নয়।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম খোরাসানও মন্তব্য করেছে, যদি চুক্তিবিরোধীদের মতপ্রকাশ ও সমাবেশের সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে সমর্থকদেরও একই সুযোগ দেওয়া উচিত। এতে জনমতের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সমঝোতা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্যও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তিনি এটি সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়কার ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির তুলনায় বেশি কার্যকর বলে তুলে ধরতে চাইছেন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, দুই চুক্তির সরাসরি তুলনা সহজ নয়। ২০১৫ সালের চুক্তি ছিল মূলত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রিক একটি বিস্তারিত আন্তর্জাতিক সমঝোতা। বিপরীতে বর্তমান সমঝোতার মূল লক্ষ্য আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো এবং যুদ্ধবিরতির জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করা।
সমালোচকেরা দাবি করছেন, সামরিক চাপ ও সংঘাতের পথ না বেছে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেও অনুরূপ ফল অর্জন করা সম্ভব ছিল। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রমাণ করা যে নতুন সমঝোতাটি বাস্তবিক অর্থেই আগের চুক্তির তুলনায় বেশি কার্যকর ও ফলপ্রসূ।
এই বিভাগের আরও খবর
ট্রেন্ডিং
সর্বাধিক পঠিত
- সাতক্ষীরা জেলার দুজন সাংসদকে মন্ত্রী দাবি
- বড় চমক থাকছে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে
- চাল আমদানি নিরুৎসাহিত করতে শুল্কের পরিমাণ বৃদ্ধি
- একাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন বসছে ৩০ জানুয়ারি
- ওয়ালটনের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডোর হয়েছেন জাতীয় দলের অধিনায়ক মাশরাফি
- ঘুরে আসুন সাদা পাথরের দেশে
- শেখ হাসিনার যত রেকর্ড
- ঘুরে আসুন সিকিম
- অ্যাশ-ম্যাশের স্বাগত খুনসুটি
- ভোটারদের সঙ্গে সালমানের শুভেচ্ছা বিনিময়